সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৬-৭:
পুনরালোচনা: মুত্তাকীন থেকে কাফিরদের দিকে
সূরা আল-বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াতে মুত্তাকীন (আল্লাহভীরু) এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা ছিল — অদৃশ্যে বিশ্বাস, সালাত কায়েম করা, আল্লাহর পথে ব্যয় করা, সমস্ত ওহীতে বিশ্বাস, এবং আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। এই কারণেই মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর সাথে আমাদের সবসময় নিজেদের মিলিয়ে দেখা উচিত যে তাকওয়ার প্রতিযোগিতায় আমরা কতদূর অগ্রসর হয়েছি। কারণ কুরআন থেকে হিদায়াত পাওয়া নির্ভর করে আমাদের তাকওয়ার স্তরের উপর। এরপর এই পাঁচটি আয়াতের পর, এই পাঁচ আয়াতের পরের দুটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের কাফিরদের সম্পর্কে বলছেন :
আয়াত ৬-৭
(৬) إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ “নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, তাদের জন্য সমান — আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।”
(৭) خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰ أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ “আল্লাহ তাদের অন্তরে ও তাদের কানে মোহর মেরে দিয়েছেন, এবং তাদের দৃষ্টির উপর রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”
উপরিভাগে পড়লে এই দুই আয়াত যেন বলছে: একদল মানুষ কখনোই ঈমান আনবে না, আপনি যা-ই করুন না কেন, কারণ আল্লাহ তাদের অন্তরে, শ্রবণশক্তিতে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টি ঢেকে দিয়েছেন। এই পরিণতিতে কোনো সন্দেহ নেই — এটা চূড়ান্ত। তাহলে উপরিভাগে দেখে মনে হয়, তাদের সতর্ক করার কোনো লাভ নেই।
কিন্তু — এই আপাত অর্থটিই উদ্দিষ্ট অর্থ নয়। কেন নয়, তা বোঝার আগে আমাদের কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মৌলিক নীতি: ওহী একটি সংযুক্ত বক্তব্য
কুরআন এবং বিশুদ্ধ সুন্নাহ একত্রে একটিমাত্র ওহীর দেহ গঠন করে। কুরআনের সমস্ত আয়াত এবং সমস্ত হাদিসকে একে অপরের আলোকে বুঝতে হবে — বিচ্ছিন্নভাবে নয়। যদি কোনো একটি আয়াত বা হাদিসকে বিচ্ছিন্ন করে, একই বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যা কিছু বলেছেন তার বাকি সব থেকে আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে ফলাফল ভুল সিদ্ধান্তে পরিণত হবে, যদিও ব্যক্তির উদ্দেশ্য ভালো থাকতে পারে।
এটা কোনো ছোটখাটো প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। ইসলামের নামে যত ফিরকা ও বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে, এবং মুসলিমদের মধ্যে যত বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, প্রায় সবগুলোর মূলে রয়েছে এই একই ভুল: কেউ একটি আয়াত বা একটি হাদিস নিল — প্রায়শই সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে আকর্ষণীয়টি — বাকি সমস্ত প্রমাণ থেকে বিচ্ছিন্ন করল, এবং তার উপর একটা মতবাদ দাঁড় করাল। সেই বিচ্ছিন্ন আয়াতটিই হয়ে যায় “সেই বিভ্রান্তির” পক্ষে প্রমাণপত্র।
একটি জাগতিক উদাহরণ: অফিস ম্যানেজার
কল্পনা করুন, একজন ম্যানেজারকে কোম্পানির মালিক বলে দিলেন: “ঈদের আগে কাউকে ছুটি দেওয়া যাবে না — সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া, কোনো অবস্থাতেই না।” এই নির্দেশ একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করা হলো। কিন্তু অন্য একটি অনুষ্ঠানে সেই একই মালিক যোগ করলেন: “যদি সত্যিকারের জরুরি অবস্থা হয় — কেউ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, বা এরকম কিছু — সেটা ভিন্ন ব্যাপার।” আর আলাদাভাবে, কোম্পানির নিয়মাবলীতে লেখা আছে যে, কোনো কর্মচারীকে জরুরি আইনি বিষয়ে আদালতে হাজির হতে হলে তিনি ছুটি পাওয়ার অধিকারী।
এই তিনটি বক্তব্য একত্রে সম্পূর্ণ নীতিমালা তৈরি করে। এখন ধরুন এক কর্মচারী জমি সংক্রান্ত মামলায় আদালতে হাজির হতে ছুটি চাইলেন, আর ম্যানেজার শুধু প্রথম নির্দেশ (“ঈদের আগে ছুটি নেই”) উল্লেখ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। মালিক যখন এটা জানবেন, তিনি ন্যায্যভাবেই বিরক্ত হবেন — ম্যানেজার মিথ্যা বলেছেন বলে নয়, বরং তিনি বাকি কথাগুলো উপেক্ষা করেছেন বলে। কেউই চায় না তার কথাকে খণ্ডিতভাবে নেওয়া হোক; মানুষ সবসময়ই বলে, “সেই উক্তিটি প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া হয়েছে।” আল্লাহর বাণীর ক্ষেত্রে এটা আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দুটি আয়াত যা এই বিপদ তুলে ধরে
ক্ষমা সম্পর্কিত দুটি আয়াত বিবেচনা করুন:
১. “নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না যে তাঁর সাথে শরীক করা হোক” (শিরক)।সূরা আন নিসা, ৪ : ৪৮, ১১৬
২. “নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।” সূরা আয যুমার, ৩৯ : ৫৩
কেউ যদি শুধু প্রথম আয়াতটি জানে, আর পঞ্চাশ বছর শিরকে কাটানো একজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে, সে ভুলভাবে তাকে বলতে পারে যে ইসলাম গ্রহণের কোনো লাভ নেই। কেউ যদি শুধু দ্বিতীয় আয়াতটি জানে, আর তার বাবা-মা শিরকের অবস্থায় মারা গেলে, সে ভুলভাবে সান্ত্বনা দিতে পারে যে আল্লাহ হয়তো তাদের ক্ষমা করবেন এবং তাদের জন্য দোয়া চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
দুটি সিদ্ধান্তই ভুল, কারণ প্রতিটি একটিমাত্র আয়াত থেকে টানা হয়েছে। বাকি সব প্রমাণের সাথে মিলিয়ে দেখলে সঠিক চিত্র বেরিয়ে আসে: প্রথম আয়াতটি প্রযোজ্য সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে তওবা না করে শিরকের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে — যে সত্য জেনেও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয় আয়াতটি প্রযোজ্য সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে তওবা করে। তওবার দরজা মৃত্যু পর্যন্ত খোলা থাকে; এমনকি যে ব্যক্তি সারাজীবন কাফির ছিল, সে তার শেষ মুহূর্তেও ইসলাম গ্রহণ করতে পারে, এবং ইসলাম গ্রহণের এই কাজটিই তার তওবা হিসেবে কাজ করে, পূর্বের গুনাহের হিসাব মুছে দেয়। এমনকি যে মুসলিম হৃদয়ে মুরতাদ হয়ে যায়, যদি সে পরে তওবা করে, সেই তওবাও গৃহীত হয় — গুনাহ যত বড়ই হোক, যতবারই হোক — মৃত্যুর আগে হলেই।
“শুধু কুরআন” ফিরকা: একটি দৃষ্টান্ত
একটি আধুনিক দল আছে, যাদের কখনো কখনো “কুরআনিয়ূন” বলা হয়, যারা দাবি করে তারা শুধু কুরআন মানে এবং হাদিস প্রত্যাখ্যান করে। প্রকৃতপক্ষে, এমন ব্যক্তি নিজেই কুরআনকে প্রত্যাখ্যানকারী, কারণ কুরআনই রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যের নির্দেশ দেয় — নামটি নিছক একটি সুন্দর শোনার লেবেল একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থানের জন্য, আর বিভ্রান্তি প্রায়ই সুন্দর নাম পরে আসে।
এই দলের সদস্যরা সাধারণত এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে: “আমরা কিতাবে কিছুই বাদ দিইনি” (মা ফাররাত্না ফিল-কিতাবি মিন শাই)। তাদের যুক্তি এমন: কুরআন যদি বলে “কিতাবে” কিছু বাদ যায়নি, আর তারা ধরে নেয় “কিতাব” মানে কুরআন, তাহলে কুরআনের বাইরে — হাদিস সহ — আর কিছুরই প্রয়োজন নেই।
এই যুক্তি একাধিক স্তরে ব্যর্থ হয়। প্রথমত, একটি সুপরিচিত পণ্ডিতী মত রয়েছে যে এই নির্দিষ্ট আয়াতে “কিতাব” বলতে কুরআন বোঝানো হয়নি, বরং লাওহে মাহফুজ (সংরক্ষিত ফলক) বোঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি কুরআন ছাড়া সব কিছু প্রত্যাখ্যান করে, তার কাছে এমনকি এটা প্রতিষ্ঠা করার কোনো উপায় নেই যে এখানে “কিতাব” মানে কুরআন, কারণ সেই শনাক্তকরণের জন্যও আয়াতের বাইরের প্রমাণ প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয়ত, এটা বাদ দিলেও — আরবিতে “কিতাব” মানে শুধু যা কিছু লেখা হয়েছে; এটা বাঁধাই করা স্ক্রল হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলকভাবে: এমনকি যদি ধরে নেওয়া হয় যে এই আয়াতটি কুরআনকে নির্দেশ করে — কুরআন নিজেই পঞ্চাশ থেকে একশটি আয়াতে, বিভিন্নভাবে বলা, বারবার রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যের নির্দেশ দেয় এবং বলে যে তাঁকে অনুসরণ করাই হিদায়াতের পথ, এবং তিনি যা দেন তা গ্রহণ করতে হবে আর যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে নিজেদের অনুমান মেনে নিলেও সিদ্ধান্তটি ভেঙে পড়ে: আল্লাহ রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিতে বাদ দেননি। একটি আয়াত নিয়ে বাকি পঞ্চাশ বা একশটি বাদ দেওয়া “শুধু কুরআন মানা” নয় — এটা হয় কুরআন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা, নয়তো একটি বাছাইকৃত নির্বাচন যা নিজেই কুরআনকে প্রত্যাখ্যান করা।
বৃহত্তর শিক্ষা: কুরআন ও সুন্নাহর একটি অংশকে আরেকটি অংশ দিয়ে ব্যাখ্যা না করাই প্রতিটি বিচ্যুত ফিরকার বিভ্রান্তির মূল উৎস, পুরনো হোক বা নতুন মোড়কে।
নীতিটি আয়াত ৬-৭-এ প্রয়োগ
এই নীতি প্রতিষ্ঠার পর আমরা ফিরে আসি: “নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে — আপনি তাদের সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।”
আপাত অর্থ হলো, কাফিরদের সতর্ক করা নিরর্থক, কারণ আল্লাহ ইতিমধ্যেই তাদের অন্তর, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টি মোহর মেরে দিয়েছেন — একটি স্থির ও নিশ্চিত পরিণতি। কিন্তু এটা উদ্দিষ্ট অর্থ নয় , তিনটি কারণে।
কারণ ১: অন্যান্য আয়াত ও হাদিস সক্রিয়ভাবে দাওয়াতকে উৎসাহিত করে এবং এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করে
কুরআন বারবার “হিকমত এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে” (উদ’উ ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল-হিকমাতি ওয়াল-মাওইজাতিল-হাসানাহ) মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার নির্দেশ দেয় — এমন বক্তব্য যা হৃদয়কে স্পর্শ করে ও মানুষকে পরিবর্তন করে। যদি দাওয়াত কুফরের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে অকার্যকর হতো, তাহলে কুরআনের এত জোর, উৎসাহ এবং পুরস্কারের কোনো কারণ থাকত না মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার কাজে। রাসূল ﷺ-এর মিশন এবং তাঁর পরবর্তী অনুসারীদের মিশনের অস্তিত্বই দাঁড়িয়ে আছে এই ভিত্তিতে যে আহ্বান কাজ করে।
কারণ ২: অনেক শ্রেষ্ঠ মানুষ সতর্কবার্তা পেয়েও ঈমান এনেছেন
সাহাবীদের সেরা প্রজন্ম, ইসলামের আগে, কাফির ও মুশরিক ছিলেন। তাঁদের অনেকেই ইসলামের বার্তা ও সতর্কবার্তা শুনেছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন, শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছেন। যদি এই আয়াত সকল কাফিরের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রযোজ্য হতো, তাহলে এটা অসম্ভব হতো। এটা একাই প্রমাণ করে যে, আয়াতটি বিশ্বাস প্রত্যাখ্যানকারী সকলের জন্য একটি সাধারণ বিবৃতি হতে পারে না।
কারণ ৩: সালাফের (শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্মের) বক্তব্য
সঠিক বোঝাপড়া যাচাই করার চূড়ান্ত মানদণ্ড সবসময়ই সালাফ — সাহাবী, তাঁদের ছাত্র এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের বক্তব্য। এই আয়াতের ব্যাপারে তাঁদের তাফসীর যেকোনো অস্পষ্টতা দূর করে দেয়।
দাওয়াত নিশ্চিত কাফিরদের কাছেও পৌঁছায় — প্রমাণ
সালাফের ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে, বেশ কিছু প্রমাণ দেওয়া হয়েছিল যে আহ্বান কুফরে গভীরভাবে ডুবে থাকা মানুষের ক্ষেত্রেও হিদায়াত তৈরি করতে পারে এবং করে।
দলিল ১ — সূরা আল আনআম, ৬ : ১২২
“যে মৃত অবস্থায় থাকার পর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন এক আলো দিয়েছি যা দিয়ে সে মানুষের মাঝে পথ চলে, সে কি এমন ব্যক্তির মত যে বহুবিধ অন্ধকারে ডুবে আছে – যা থেকে সে বের হওয়ার পথ পায় না? এভাবেই কাফেরদের দৃষ্টিতে তাদের কাজগুলোকে সুশোভিত করা হয়েছে।”
“ ইবনে আব্বাস এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন: সে কাফির ছিল, আর আল্লাহ তাকে হিদায়াত দিয়েছেন — আক্ষরিক মৃত্যু নয়, বরং ঈমানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মৃত্যু ও পুনরুজ্জীবন।
দলিল ২ — খাইবারের হাদীস
খাইবারের পতাকার হাদিস: খাইবারের ইহুদি দুর্গ অবরোধের সময়, যখন মুসলিমরা কিছুদিন ধরে ভেদ করতে পারছিল না, রাসূল ﷺ ঘোষণা করলেন যে পরদিন তিনি পতাকা দেবেন এমন একজনকে “যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাকে ভালোবাসেন।” প্রতিটি সাহাবী এটা পাওয়ার আশা করছিলেন। সকালে রাসূল ﷺ আলী ইবনে আবি তালিবকে খুঁজলেন, যাঁর চোখে অসুখ ছিল বলে আসেননি। তাঁকে আনা হলো, রাসূল ﷺ তাঁর লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দোয়া করলেন, আর অসুখ এমনভাবে সেরে গেল যেন কখনো ছিলই না। পতাকা তাঁর হাতে দিয়ে রাসূল ﷺ তাঁকে নির্দেশ দিলেন খাইবারবাসী তাদের সাথে যোগ না দেওয়া পর্যন্ত লড়াই করতে — প্রথমে তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করে, আল্লাহর অধিকারগুলো তাদের কাছে স্পষ্ট করে — এবং বললেন: “আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন, তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম” (আরবদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি)।
এই হাদিস সরাসরি প্রমাণ করে যে নিজের দাওয়াতের প্রচেষ্টার মাধ্যমে হিদায়াত একটা বাস্তব, বিশাল পুরস্কার — অর্থাৎ কুফর সবার জন্য বন্ধ দরজা নয়।
দলিল ৩ — ইহুদী কিশোরের হাদীস
ইহুদি বালকের হাদিস: রাসূল ﷺ-এর সেবা করত এমন এক ইহুদি বালক অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাসূল ﷺ তাকে দেখতে গেলেন, তার মাথার কাছে বসলেন, এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। বালকটি সেখানে উপস্থিত তার বাবার দিকে তাকাল, যেন অনুমতি চাইছে। বাবা বললেন, “আবুল কাসিমের (রাসূল ﷺ) কথা মানো।” বালকটি ইসলাম গ্রহণ করল এবং অল্প পরেই মারা গেল। রাসূল ﷺ চলে যাওয়ার সময় বললেন: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে আগুন থেকে রক্ষা করেছেন।” বাবা নিজে ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবু দাওয়াত মৃত্যুর একেবারে কিনারায় থাকা ছেলেটিকে পৌঁছেছিল এবং বদলে দিয়েছিল।
এই উদাহরণগুলো সিদ্ধান্তমূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করে যে আহ্বান কার্যকর এবং কুফর সকলের জন্য একটি অচল, স্থায়ী অবস্থা নয়।
আয়াত ৬-এর ব্যাপারে সালাফের তিনটি মত :
“নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে… তারা ঈমান আনবে না” — এতে ফিরে আসি। তাফসীরের ঐতিহ্য, বিশেষত মাওসুআতুত-তাফসীর বিল-মাসুর (সালাফ থেকে বর্ণিত ব্যাখ্যার একটি বিশ্বকোষীয় সংকলন, প্রায় ২৪ খণ্ড জুড়ে) সংরক্ষণ করে, এই আয়াতটি ঠিক কাদের বোঝায় সে সম্পর্কে তিনটি ভিন্ন ব্যাখ্যা।
মত ১ (ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত): রাসূল ﷺ সকলের হিদায়াতের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে জানালেন যে একটি নির্দিষ্ট দল — যাদের নিয়তি কুফর হিসেবে লেখা হয়ে গেছে — তারা যত চেষ্টাই করা হোক ঈমান আনবে না। ইবনে উসাইমীন উল্লেখ করেছেন, এই আয়াতে রাসূল ﷺ-এর জন্য এক ধরনের সান্ত্বনা রয়েছে: সবাই হিদায়াত পাবে না, আর এই পরিণতি তাঁর কোনো ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়।(ইবনু উসায়মীন)
মত ২ (ইবনে আব্বাস থেকেই, ভিন্ন সূত্রে বর্ণিত): এটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য — মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের কিছু ইহুদি পণ্ডিত ও মুনাফিক নেতা — যাঁরা নিজেদের কিতাব থেকে জানা সত্ত্বেও যে মুহাম্মাদ ﷺ সত্য নবী, ঈর্ষা বা নেতৃত্ব ধরে রাখার লোভে তা মানতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁরা জ্ঞানসহ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি বেছে নিয়েছিলেন। তবু, তাঁদের দাওয়াত দেওয়া অব্যাহত ছিল, কারণ বাহ্যিকভাবে প্রতিরোধী কেউ আসলে হিদায়াতের জন্য নির্ধারিত কিনা তা আগে থেকে কেউ জানতে পারে না।
মত ৩ (তাবিয়ী আবুল আলিয়া থেকে বর্ণিত): এটি বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশ নেতাদের বোঝায় — আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালাফ, ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা এবং অন্যান্য — যাঁরা অহংকারের কারণে রাসূল ﷺ-এর বিরোধিতা করেছিলেন যতক্ষণ না তাঁরা সেই অবস্থাতেই মারা যান।
এই তিনটি মত পরস্পরবিরোধী নয়; এগুলো একই অন্তর্নিহিত বিষয়ের দৃষ্টান্ত — আয়াতটি সকল কাফিরের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাঁরা স্পষ্ট সত্য পৌঁছানোর পরও প্রত্যাখ্যানে অটল থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন, অথবা যাঁদের সেই পরিণতি আল্লাহর কাছে আগে থেকেই জানা ছিল। কেউ কেউ একাধিক শ্রেণিতে পড়েন (বদরের নেতারা, উদাহরণস্বরূপ, স্পষ্টতই “কুফরে মৃত্যু” এবং “কুরাইশ নেতৃত্ব” উভয় বর্ণনায় পড়েন)।