প্রথম আয়াত: আলিফ লাম মীম — হুরুফে মুকাত্তাআত

সূরা আল-বাকারার প্রথম আয়াত হলো الم (আলিফ লাম মীম)। এগুলো প্রকৃতপক্ষে বিচ্ছিন্ন অক্ষর (হুরুফে মুকাত্তাআত), এবং বিচ্ছিন্ন অক্ষরের নিজস্ব কোনো অর্থ থাকে না। যেমন যেকোনো ভাষায় — বাংলায় যদি আমি ক, খ, গ, ঘ বলি, বা ইংরেজিতে A, B, C, D আলাদা আলাদা অক্ষর হিসেবে কোনো অর্থ বহন করে না। অক্ষরগুলো একসাথে হলে শব্দের অর্থ তৈরি হয়, আর শব্দগুলো একসাথে হলে বাক্য তৈরি হয়।

কুরআনের কতগুলো সূরার শুরুতে এই বিচ্ছিন্ন অক্ষর পাওয়া যায় এবং কতগুলো অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে? এই বিচ্ছিন্ন অক্ষর কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে পাওয়া যায়, এবং এতে মোট ১৪টি বর্ণ রয়েছে। এই তালিকা মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই, তবে কোন বিচ্ছিন্ন অক্ষর কোন সূরার শুরুতে আছে, তা জেনে রাখা আগ্রহের বিষয় হতে পারে।

আলিফ লাম মীম ছয়টি সূরার শুরুতে আছে। সবচেয়ে বেশি হা মীম — সাতটি সূরার শুরুতে। আবার আলিফ লাম রা পাঁচটি সূরার শুরুতে। একটি সূরার নাম দুই জায়গায় দেখা যাবে — সূরা আশ-শূরায় হা মীম এবং আইন সীন কাফ দুটোই আছে। এছাড়া তা সীন মীম দুটি সূরায় আছে — সূরা শু’আরা ও সূরা কাসাস — আর বাকিগুলো একটি করে সূরার শুরুতে আছে। যেমন আলিফ লাম মীম সাদ, অথবা একক বর্ণ — নূন, সাদ, ইয়াসীন বা ত্বাহা ইত্যাদি।

হরফ সূরাসমূহ
الٓمٓ সূরা আল-বাক্বারা, সূরা আলে ইমরান, সূরা আল আনকাবুত, সূরা আর রূম, সূরা লোকমান, সূরা আস সাজদা
الٓر সূরা ইউনূস, সূরা হূদ, সূরা ইউসুফ, সূরা ইব্রাহীম, সূরা আল হিজর
الٓمٓر সূরা আর রাদ
طسٓمٓ সূরা আশ শুআরা, সূরা আল-ক্বাসাস
طسٓ সূরা আন-নামল
طه সূরা তা-হা
يسٓ সূরা ইয়াসীন
قٓ সূরা ক্বাফ
عٓسٓقٓ সূরা আশ শূরা
الٓمٓصٓ সূরা আল-আরাফ
كٓهيعٓصٓ সূরা মারইয়াম
صٓ সূরা সাদ
حمٓ সূরা গাফির, সূরা ফুসসিলাত, সূরা আয যুখরুফ, সূরা আদ-দুখান, সূরা আল জাসিয়া, সূরা আল-আহকাফ, সূরা আশ শূরা
نٓ সূরা আল-ক্বলম

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না, তবে মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ উল্লেখ করেছেন। এতে কী ইঙ্গিত রয়েছে, এর তাৎপর্য কী — এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, তবুও আল্লাহ কেন এগুলো নাযিল করলেন? মুফাসসিরগণ অতীত থেকে এ নিয়ে গবেষণা করে এসেছেন।

সালাফদের ব্যাখ্যা: ইমাম তাবারী

ইমাম তাবারীর সময়কাল ছিল ৩১০ হিজরি — অর্থাৎ বেশ প্রাথমিক যুগ। ইমাম তাবারীর আগে মুসলিম উম্মাহর সর্বোত্তম তিনটি প্রজন্ম অতিবাহিত হয়েছিল — সাহাবীদের প্রজন্ম, তাবি’ঈনদের প্রজন্ম এবং তাবা-তাবি’ঈনদের প্রজন্ম। এই তিন প্রজন্মের তাফসীরই আমাদের তাফসীরের ভিত্তি — বিশুদ্ধ তাফসীর। কারণ তারাই সর্বোত্তম প্রজন্ম। “আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার প্রজন্ম” — অর্থাৎ সাহাবীগণ, এরপর তাদের পরের দুই প্রজন্ম। এই তিন প্রজন্ম সর্বোত্তম প্রজন্ম, এবং কুরআন সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়াও ছিল সর্বোত্তম।

তাদের তাফসীর সাধারণত বর্ণনার আকারে পাওয়া যায় — ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই আয়াতের এই শব্দ সম্পর্কে এটি বলেছেন, সনদসহ পাওয়া যায়; ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সনদসহ এটি বলেছেন — এগুলো হাদিস ও তাফসীরের গ্রন্থে পাওয়া যায়। সাহাবীরা আজকের মুফাসসিরদের মতো শব্দে শব্দে কুরআনের তাফসীর করতেন না। আজ কাউকে তাফসীর করতে বললে বোঝা যায় — আয়াতের প্রতিটি শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করা হবে, বাক্যের অর্থ ব্যাখ্যা করা হবে, তা থেকে কী বোঝা গেল তা ব্যাখ্যা করা হবে ইত্যাদি। সাহাবী বা তাবি’ঈনরা সবসময় এভাবে তাফসীর করতেন না, কারণ তারা আরব ছিলেন এবং আরবি ভাষা শুনেই তারা কুরআনের মূল অর্থ বুঝতেন।

তবে কিছু শব্দ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো, অথবা কিছু আয়াত সমন্বয় করার প্রয়োজন হতো। কিছু শাস্তীয় (শারয়ী) দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ত। যখন এই প্রয়োজন দেখা দিত যে সবাই এই শব্দটি বুঝবেন না, অথবা কোনো পরিভাষা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে, তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করতেন, সাহাবীরাও তাই করতেন। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় — যখনই কোনো শব্দ ব্যাখ্যা করা হয়নি, তখন তা আরবিতে তার বাহ্যিক অর্থেই বুঝতে হবে।

উদাহরণ — জুলুম শব্দের ব্যাখ্যা: আল্লাহ যখন এই আয়াত নাযিল করলেন — “যারা ঈমান আনে এবং তাদের ঈমানের সাথে জুলুম মিশ্রিত করে না, তারাই নিরাপদ এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত” — তখন সাহাবীদের একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েছিল। কেন প্রয়োজন পড়েছিল? কারণ সাহাবীরা প্রথমে আয়াতটি আক্ষরিক অর্থে বুঝেছিলেন যে, ঈমানের সাথে কোনোরকম জুলুম মিশ্রিত না থাকলেই নিরাপদ থাকা যাবে, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এবং হিদায়াত পাওয়া যাবে। আরবিতে জুলুম বলতে ছোট-বড় সব ধরনের অন্যায়কে বোঝায়। সাহাবীরা এটি খুব ভালোভাবেই জানতেন, আর তাদের কাছে এটি কঠিন মনে হয়েছিল — যদি ঈমানের পর নিরাপদ থাকতে হয়, শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে হয়, হিদায়াত পেতে হয়, তাহলে কোনোভাবেই — ছোট হোক বা বড় — জুলুম করা যাবে না, এমনকি নিজের প্রতিও নয়। তারা এ নিয়ে চুপ থাকেননি, বরং প্রশ্ন করেছিলেন — প্রতিটি অক্ষরের জন্য দশটি সওয়াবের আশা না করে, তারা এর অর্থ জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তারা তা বাস্তবায়ন করবেন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করলেন যে বিষয়টি তারা যেমন ভাবছেন তেমন নয়। তিনি অন্য একটি আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন — লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বলছেন: “হে বৎস, শিরক কোরো না, নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।” এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করলেন যে, ঈমানের পর যে জুলুমের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা শিরক বোঝানো হয়েছে — এখানে “জুলুম” শব্দটি শিরক অর্থেই এসেছে। তাই মৌলিক নিরাপত্তা ও হিদায়াত পেতে হলে ঈমানের পাশাপাশি নিজের ঈমানকে শিরক থেকে রক্ষা করতে হবে।

এসব বলার উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, সাহাবীদের প্রথম তিন প্রজন্ম আরবি হওয়ায়, যে শব্দের নতুন অর্থ যোগ হয়েছে বা বিশেষ শারয়ী অর্থ বোঝানো হয়েছে, শুধু সেটুকুই ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো। বাকি সব শব্দ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না, কারণ তারা তা আরবি ভাষা থেকেই বুঝতেন। তাই সাহাবীদের কাছ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন পূর্ণাঙ্গ তাফসীর পাওয়া যায় না যেমনটা আমরা এখন প্রত্যাশা করি। এ ধরনের তাফসীরের প্রথম ও সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হলো ইমাম তাবারীর তাফসীর, যেখানে তিনি অনেক কিছু ব্যাখ্যা করেছেন — যদিও তখনও প্রতিটি শব্দ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়নি, কারণ তা আরবি।

ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) যা করেছেন তা হলো — সালাফদের এই তিন প্রজন্মের মতামত একত্র করা। “সালাফ” শব্দ শুনে অনেকে মনে করতে পারেন এটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের বিষয়। এটি কোনো দলের বিষয় নয় — আমরা সবাই সালাফের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত রাখতে বাধ্য। এটি ইসলামের মূলধারা। কারণ কেউ নতুন করে ইসলামের শিক্ষা আবিষ্কার করবে না — তা অবশ্যই এই তিন প্রজন্মের হাত থেকে আসতে হবে। তাদের কাছ থেকেই আমরা কুরআন ও হাদিস পেয়েছি — মূল টেক্সট এবং তার ব্যাখ্যা, দুটোই তাদের কাছ থেকে পাওয়া।

ইমাম তাবারীর মতো ব্যক্তিরা যখন এলেন, তারা তাফসীর খুলে দেখলেন — কোনো আয়াত সম্পর্কে সাহাবীরা কী বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ, “আলিফ লাম মীম” খুললে এ সম্পর্কে ১৩টি বক্তব্য পাওয়া যায় — এই প্রথম তিন প্রজন্মের। ইমাম তাবারী যেহেতু পরবর্তী ইমাম (৩১০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন), তিনি প্রথম তিন প্রজন্মের পরের ব্যক্তি। তিনি প্রথমে সনদসহ উল্লেখ করেন — ইবনে আব্বাস এটি বলেছেন, ইবনে মাসউদ এটি বলেছেন, আলী এটি বলেছেন, যার যা বক্তব্য আছে; এরপর তাবি’ঈনদের মধ্যে মুজাহিদ কী বলেছেন, কাতাদাহ কী বলেছেন, তৃতীয় প্রজন্মে যায়েদ ইবনে আসলাম কী বলেছেন, মুকাতিল কী বলেছেন — এরপর তিনি তাদের বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করে নিজের গবেষণা উপস্থাপন করেন, এবং মাঝে মাঝে ভাষাবিদদের মতামতও যুক্ত করেন।

এখানে দেখা যায় যে, আলিফ লাম মীম এবং এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো — যা কুরআনের ২৯টি সূরার শুরুতে আছে — সে সম্পর্কে ১৩টি বক্তব্য পাওয়া যায়। এখান থেকে ভাবার বিষয় হলো — আলিফ লাম মীম, হা মীম, ইয়াসীন, কাফ, নূন — এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, তবু নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ কোনো কারণে এটি নাযিল করেছেন, এর একটি তাৎপর্য রয়েছে। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর অর্থ সম্পর্কে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, তবুও সাহাবী ও তাবি’ঈনদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ১৩ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।

এখান থেকে যে উপসংহার টানা যায় তা হলো — আমাদের প্রাথমিক প্রজন্ম, যাদের আমরা “সালাফ” বলছি — সাহাবী, তাবি’ঈন ও তাবা-তাবি’ঈন — কুরআনের অর্থ জানতে ও ব্যাখ্যা করতে অত্যন্ত আগ্রহী ও গভীরভাবে সিরিয়াস ছিলেন। এই কারণেই অনেকের কাছ থেকে শোনা যেতে পারে যে, “আলিফ লাম মীম হা মীম-এর তাফসীর করা যায় না, কেউ এর তাফসীর করেননি, একমাত্র আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন” — এখানেই বিষয়টি শেষ। কিন্তু যেকোনো দাবির সঠিকতা বুঝতে চাইলে কোথায় ফিরে যেতে হবে? সালাফ কী বলেছেন, সেখানে ফিরে যেতে হবে। মূলে ফিরে যেতে হবে। আমরা যদি মূলে ফিরে যেতে পারতাম, আজ এত বিভ্রান্তি থাকত না। এখন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা দেখলে দেখা যায়, সর্বত্র বিবাদ — প্রতিটি বিষয়ে বিবাদ ও মতভেদ, একে অপরকে পথভ্রষ্ট বলা। এই সব বিবাদ ও মতভেদ সমাধান করা সম্ভব ছিল, এখনও সম্ভব — যদি আমরা সেই একটি জায়গায়, অর্থাৎ সালাফের বক্তব্যরূপ মূলে ফিরে যাই।

তাফসীরের ক্ষেত্রেও তাই — সাহাবীরা কী করেছেন তা দেখা প্রয়োজন। সাহাবীরা এসেই বলেননি যে “এ নিয়ে কথা বলা যাবে না।” বরং তারা তাফসীর করেছেন — যদিও এর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, তবুও তারা ইঙ্গিত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন — হয়তো অর্থ নেই, কিন্তু কোনো কারণ আছে কি, কোনো ইঙ্গিত আছে কি? তাবি’ঈনরাও বলেছেন, হ্যাঁ, এতে ইঙ্গিত আছে।

ইবনুল জাওযীর জাদুল মাসীর

আরেকজন, একটু পরের যুগের — ইবনুল জাওযী, ইমাম তাবারীর (৩১০ হিজরি) পরের যুগের ব্যক্তি। তাঁর গ্রন্থের নাম “জাদুল মাসীর”। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ইমাম তাবারীর মতো বিশাল তাফসীর নয় — ইমাম তাবারীর তাফসীর প্রায় ২৪ খণ্ড, আর জাদুল মাসীর ছয় খণ্ড। এর বিশেষত্ব হলো, এতে শুধু “আকওয়াল” অর্থাৎ মতামত বর্ণনা করা হয় — কোনো শব্দ বা আয়াতের অর্থ নিয়ে যদি বিভিন্ন মত থাকে — তিন, চার, পাঁচ, ছয় যতগুলোই হোক — সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

এই গ্রন্থে “আলিফ লাম মীম” ও হুরুফে মুকাত্তাআত সম্পর্কে ছয়টি ভিন্ন মতামত উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপে তা এখানে তুলে ধরা হলো:

  • মত ১ — ইসমুল আযমের ইঙ্গিত: কেউ বলেন এগুলো আল্লাহর “ইসমুল আযম”-এর ইঙ্গিত। অর্থাৎ এটি এনকোড করা কিছু — এগুলো অক্ষর, এদের অর্থ নেই; আমরা যদি ডিকোড করতে পারি, আমরা জানব যে এটি আল্লাহর “ইসমুল আযম” (সর্বশ্রেষ্ঠ নাম)। আমরা যদি আল্লাহকে যেকোনো নামে ডাকি, আল্লাহ অবশ্যই তা দেবেন।
  • মত ২ — “আল্লাহ” নাম: কারো মতে, এটি “আল্লাহ” নামে (ইঙ্গিত করে)।
  • মত ৩ — কসমের নাম: কারো মতে, এগুলো আল্লাহর নাম যেগুলো দিয়ে তিনি কসম খেয়েছেন। এগুলো এক ধরনের কসম এবং আল্লাহর নামের কসম।
  • মত ৪ — কুরআনের নাম: কেউ বলেন এগুলো কুরআনের নাম, কুরআনের বিভিন্ন নাম।
  • মত ৫ — সূরার নাম: কেউ বলেন এগুলো সূরার নাম।
  • মত ৬ — বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ: কেউ বলেন এগুলো আসলে কিছু বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত — তিনি বললেন “আলিফ লাম মীম” মানে “আনা-আল্লাহু আলাম” — “আমি আল্লাহ, আমি সবচেয়ে বেশি জানি।” অর্থাৎ, “আলিফ লাম মীম” “আনা-আল্লাহু আলাম” বাক্যের দিকে ইঙ্গিত করছে, ইত্যাদি।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: বিভিন্ন মত আছে, কিন্তু যেহেতু এই মতগুলোর কোনোটিই হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি, আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না এগুলো সঠিক নাকি ভুল, অথবা এগুলো সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না।

ইঙ্গিত: কুরআনের অলৌকিকত্ব

শেষ মতটি হলো — এগুলো কুরআনের মু’জিযা (অলৌকিকত্ব)-র ইঙ্গিত দেয়। এই মতটি অতীতের আলেমদের মধ্যে ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) এবং সাম্প্রতিক আলেমদের মধ্যে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) সমর্থন করেছেন। ইবনে কাসীরের জন্ম প্রায় ৭০০ হিজরির দিকে, মৃত্যু ৭৭৪ হিজরিতে — অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার মাঝামাঝি সময়ে ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন। তাঁর তাফসীরও অত্যন্ত বিখ্যাত — নিশ্চয়ই এর নাম শুনেছেন, ইবনে কাসীরের তাফসীর। আর ইবনে উসাইমীন — ১৪২১ হিজরি — অর্থাৎ আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের একজন আলেম। তিনি সৌদি আরবের একজন মহান আলেম ছিলেন, প্রায় ২০০০ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন।

তারা বলছেন, এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো প্রকৃতপক্ষে আল-কুরআনের অলৌকিকত্বের দিকে ইঙ্গিত করছে। অর্থাৎ, “আলিফ লাম মীম” বলে আরবদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে — দেখো, তোমাদের সামনে আল-কুরআন রয়েছে। আরবদের জন্য, এই কুরআন এই সমস্ত অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো তোমাদের কাছে পরিচিত — আলিফ, লাম, মীম, হা, রা, সাদ, কাফ, নূন, কাফ, হা, ইয়া, আইন, সাদ। তোমাদের পরিচিত এই সব অক্ষরের সমন্বয়েই আল-কুরআন গঠিত — তবুও এর মতো একটি সূরা রচনা করা তোমাদের সাধ্যের বাইরে। সুতরাং তোমরা বুঝতে পারো, এই কুরআন আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে। এটাই এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর ইঙ্গিত। এই মত ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তা সমর্থন করেছেন।