মুনাফিকীর আলোচনায় আসার আগে আমাদের ঈমান ও কুফর সম্পর্কে একটু আলোচনা করা দরকার। কারণ মুনাফিকী হলো কুফরের একটি প্রকার। কুফরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকার হলো মুনাফিকী।

ঈমানের দুটি দিক

প্রথমত, “ঈমান” শব্দের শারঈ অর্থ হলো বিশ্বাস বা স্বীকৃতি। শরীয়াতে ঈমানের দুটি দিক আছে।

প্রথম দিকটি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত সমস্ত সংবাদকে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং তার সত্যতা স্বীকার করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত বিষয়গুলো দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ হলো সংবাদ। আমরা যখন কুরআন ও হাদীস খুলি, তখন দুটি জিনিস পাই। একটি সংবাদ, অন্যটি বিধান। সংবাদ নিয়ে আমাদের কী করতে হবে? আমাদের তা বিশ্বাস করতে হবে এবং প্রশান্ত অন্তরে গ্রহণ করতে হবে ও তার সত্যতা স্বীকার করতে হবে। ঈমানের দ্বিতীয় দিকটি বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটি কী? কুরআন ও হাদীসের সীমারেখা মেনে দ্বীন বাস্তবায়ন করা। এই দুটি মিলেই ঈমান। অর্থাৎ, কুরআন ও হাদীসের সংবাদের সঙ্গে আমরা কীভাবে আচরণ করছি এবং কুরআন ও হাদীসের বিধিনিষেধের সঙ্গে আমরা কীভাবে আচরণ করছি — এই দুটি মিলেই হবে আমাদের ঈমান।

অতএব ঈমান হলো বিশ্বাস, কথা ও কাজের সমষ্টি। যে ঈমান আনে তাকে বলা হয় মুমিন। ঈমানের অনুপস্থিতিকে বলা হয় কুফর। যে ব্যক্তি কুফরিতে লিপ্ত হয় তাকে বলা হয় কাফির। সুতরাং ঈমান কেবল অন্তরের বিশ্বাস নয়, যেমনটা অনেকে মনে করে।

কুফরের প্রকারভেদ :

ঈমানের বিপরীত হলো কুফর। কুফর কেবল অন্তরের অস্বীকৃতি নয়। কুফর অনেক কিছুর মাধ্যমে হতে পারে:

  • অবিশ্বাস ও অস্বীকৃতি — التكذيب / الجحود / الإنكار
  • সংশয় — الشكّ
  • বিমুখতা — الإعراض
  • অহংকার ও অবাধ্যতা — الاستكبار / الإباء / الامتناع
  • কটুক্তি ও বিদ্রূপ — الاستهزاء والسبّ
  • ঘৃণা — البغض
  • নিফাক — النفاق

১. প্রত্যাখ্যানের কুফর (তাকযীব, ইনকার, বা জুহুদ)

অন্তরে অবস্থানকারী অবিশ্বাস — তা কখনো বলা হোক বা না হোক — সন্দেহাতীতভাবে কুফর। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে যে নবী মুহাম্মাদ ﷺ কেবল একজন ভালো মানুষ ছিলেন কিন্তু প্রকৃত নবী নন, আর মুসলিমদের কষ্ট এড়াতে তা কখনো জোরে না বলে, সেই অন্তরের অবিশ্বাসই তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

প্রত্যাখ্যান মৌখিকও হতে পারে: 

যদি কেউ মুখে বলে যে নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন না, বা মৃত্যুর পর কোনো জীবন নেই, বা দ্বীনের কোনো মৌলিক নীতিকে মুখে অস্বীকার করে — যেমন সে তাকদীর অস্বীকার করে, যে আল্লাহ তা’আলা সবকিছু পূর্বনির্ধারণ করে রেখেছেন, “আমি বিশ্বাস করি না যে এটি ঠিক” — সে কী করল? অস্বীকৃতি, যাকে আরবিতে বলা হয় ইনকার বা জুহূদ। একে তাকযীবও বলা হয়। এই ঘোষণা দেওয়ার সময় তার অন্তরে বিশ্বাস থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে; কিন্তু কেবল মুখে এই ঘোষণা দেওয়ার কারণেই তা কুফর হবে। যদি কেউ মুখে বলে যে সে ইসলাম মানে না, যদি কেউ মুখে বলে যে সে মুসলিম নয়, “আমি মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করি না”, “নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল — আমি বিশ্বাস করি না”, অথবা সে মুখে ঘোষণা করে যে সে এটি মানে না — তার অন্তরে ঈমান থাকলেও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাকে কাফির গণ্য করা হবে। তার কাজও কুফর হবে।

একমাত্র ব্যতিক্রম:

যদি কেউ অন্তরে ঈমান থাকা সত্ত্বেও প্রাণভয়ে, যাকে আমরা সহজ ভাষায় বলি জীবনের ভয়ে, মুখে ইসলামের কোনো কিছু অস্বীকার করে, এবং সে যদি অস্বীকার না করে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে বা খুব গুরুতর ক্ষতি করা হবে — এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে, অন্তরে ঈমান থাকা সত্ত্বেও যদি নিজের জীবন বা পরিবারের কারও জীবন বাঁচাতে বা বড় ক্ষতি এড়াতে সে বাধ্য হয়ে তা বলে, তাহলে কেবল একটিই ব্যতিক্রম — “ইল্লা মান উকরিহা ওয়া কালবুহু মুতমাইন্নুম বিল ঈমান”(“যাকে বাধ্য করা হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে স্থিতিশীল রয়েছে, সে ব্যতীত”)। কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে আমাদের এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু শর্ত কী? শর্ত হলো, হুমকিটি বাস্তব হতে হবে। অর্থাৎ, অনেককে দেখা যায় এত ভয়ের কারণে নিজের পরিচয় গোপন করে, বলে “আমি মুসলিম নই”, অথবা এমন আচরণ করে যাতে কেউ বুঝতে না পারে সে মুসলিম, অথবা হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু কেউ সত্যিই তাকে হত্যা করবে — সে মুসলিম জানামাত্রই করবে — এই পরিস্থিতিতে সে পরিচয় দিল যে সে মুসলিম নয়, অথচ তার অন্তরে ঈমান আছে। এটি কেবল একটি ক্ষেত্রেই জায়েয। অন্যথায় জায়েয নয়।

অন্তরে কুফর থাকুক বা মুখে অস্বীকৃতি — উভয়ই কুফর, এবং এমন নয় যে একটি ছাড়া অন্যটি থাকে না। উভয়ই একসঙ্গে থাকতে পারে। কেউ অন্তরে কুফর করে এবং মুখেও ঘোষণা করে — তার অবস্থা খুব স্পষ্ট। অথবা কেউ মুখে ঘোষণা করে কিন্তু অন্তরে জানে — যেমন নাস্তিকরা। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অস্তিত্বের নিদর্শন এত স্পষ্ট যে বাস্তবে কোনো নাস্তিক নেই। বাস্তবে এমন কেউ নেই যে বিশ্বাস করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু সে মুখে দাবি করে — হয়তো আল্লাহর প্রতি অহংকারবশত, অথবা শরীয়ত সংক্রান্ত দ্বীনের কিছু বিষয় তার অপছন্দ। এসব কারণে সে মুখে বলে যে সে আল্লাহতে বিশ্বাস করে না, আল্লাহ নেই, “আমার মনে হয় আল্লাহ নেই, তিনি থাকলে এটা হতো, ওটা হতো।” প্রকৃতপক্ষে সে অন্তরে জানে — যেমন আল্লাহ তা’আলা ফিরআউন ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেছেন, তারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল কিন্তু তাদের অন্তরে দৃঢ় প্রত্যয় ছিল।আল্লাহ ফিরাউনের জাতি সম্পর্কে বর্ণনা করেন: “তারা তা প্রত্যাখ্যান করল, অথচ তাদের অন্তর এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল।” অনেক কুরাইশ নেতা যারা নবী ﷺ-এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং কুফরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে জানতেন এবং কখনো কখনো স্বীকারও করেছিলেন যে তিনি সত্য, সত্যবাদী রাসূল, তবু তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।

২. সন্দেহের কুফর (শাক্ক)

সন্দেহ একধরনের কুফর। যদি কেউ বলে যে মৃত্যুর পর জীবন থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে; নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সত্য নবী হতেও পারেন, নাও হতে পারেন — এসবের কী হবে? এসব সবই কুফর।

৩. মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কুফর (আল-ইঅ’রাদ) :

এটা সমাজে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান এবং প্রায়শই প্রশংসনীয় নিরপেক্ষতা হিসেবে ভুল বোঝা হয়: একজন মানুষ যে ধর্ম সম্পর্কে শিখতে বা তা পালন করতে একেবারেই আগ্রহী নয়, যে বলে “আমার সাথে ধর্ম নিয়ে কথা বলো না, আমি সৎ মানুষ, আমি কারো প্রতি অন্যায় করি না, সব ধর্মই ভালো, আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে।” এই সম্পূর্ণ অনাগ্রহ ও এড়িয়ে চলা কুফরের একটা শ্রেণি|

কেউ এমন হতে পারে যে দ্বীনের একটি অংশ পালন করে না। সে নামায পড়ে কিন্তু যাকাত দেয় না। তখন সে আংশিকভাবে বিমুখ। এতে সে কাফির হয়ে যায় না — যদি সে স্বীকার করে যে যাকাত দেওয়া উচিত, কিন্তু সম্পদের লোভে যাকাত দেয় না। এখানে সেই কথা বলা হচ্ছে না। বরং সে দ্বীন সম্পূর্ণভাবে পালন করে না এবং দ্বীন জানতেও আগ্রহী নয় — এই কথা বলা হচ্ছে। এটি একধরনের কুফর। এটি হলো ই’রাদের কুফর — বিমুখতার কুফর, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কুফর।

৪. অহংকার ও অবাধ্যতার কুফর (ইস্তিকবার)

চার নম্বর হলো অহংকার ও অবাধ্যতার কুফর। এই কুফরের একেবারে মূর্ত প্রতীক হলো ইবলীস। ইবলীসের কুফর এই শ্রেণিতে পড়ে। ইবলীসের কথা ভাবুন — ইবলীসের অন্তরে কি কুফর আছে? না। সে কি সত্য অস্বীকার করেছে? না। তার কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের কারও ইবলীসের মতো দৃঢ় প্রত্যয় নেই। দৃঢ় বিশ্বাস — কারণ ইবলীস এমন কিছু গায়েবি জিনিস দেখেছে যা আমরা দেখিনি। সুতরাং ইবলীসের কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু মজার বিষয় হলো, সে আমাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। আশ্চর্য বিষয় — শয়তান তোমার শত্রু, তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। সে নিজে দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে।

তাহলে তার কুফরটা কী ধরনের? “আবা ওয়াসতাকবারা” — সে আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানাল। অর্থাৎ সে আদেশ পালন থেকে বিরত থাকল। সে আদেশ মানল না। সে অহংকারী ও অবাধ্য হলো। অর্থাৎ, “আমি সত্য জানি, কিন্তু আমার অহংকারের কারণে আমি আল্লাহর সামনে মাথা নত করলাম না, আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করলাম না।” এই অহংকার আল্লাহর প্রতি হতে পারে। এই অহংকার নবী-রাসূলদের প্রতি হতে পারে।

যেমন, কুরআনবাদী নামে একটি দল আছে যাদের নেতারা — যারা মূলত নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আনুগত্য পছন্দ করে না — তারা মনে করে, “আমি ডাক্তার, আমি ইঞ্জিনিয়ার, আমি আইনজীবী — এই অশিক্ষিত আরবের প্রতি আমি কীভাবে অনুগত হব? কেন আমি তাঁর কাছ থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা নেব? আমি নিজেই কুরআনের ব্যাখ্যা করব।”

এটি হলো শয়তানের কুফর। এটি ছিল অহংকার। আল্লাহর অস্তিত্ব মানতে অস্বীকার নয় — বরং আল্লাহর আনুগত্য না করা, অবাধ্য হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, এমন একধরনের অবাধ্যতা আছে যা প্রবৃত্তিতাড়িত। এখানে সেই কথা বলা হচ্ছে না যে কেউ কামনার বশে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, বা সম্পদের লোভে মদ পান করে বা ব্যভিচার করে বা সুদ খায়। বরং যদি কেউ আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে অহংকার ও আত্মমর্যাদাবোধ অনুভব করে এবং সে কারণে আল্লাহর আদেশ পালন থেকে বিরত থাকে, তাহলে এটি একধরনের কুফর। এই দুটির পার্থক্য অবশ্যই বুঝতে হবে।

৫. অপমান ও উপহাসের কুফর (ইস্তিহযা)

অনেকে দ্বীন নিয়ে বা দ্বীনের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। যদি কেউ আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা দ্বীনের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয় — যেমন হিজাব ইত্যাদি — নিয়ে উপহাস করে, বা আল্লাহ ও রাসূলকে গালি দেয়, বা কার্টুন ইত্যাদি করে, তবে এটি কুফর। যদি কেউ দ্বীনের কোনো বিষয়, কোনো বিধান, আল্লাহ বা আল্লাহর রাসূল বা দ্বীনের কোনো বিধানকে ঘৃণা করে, তবে তা একধরনের কুফর।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানতে হবে: একটি হলো দ্বীনের বিধান পালন করতে গিয়ে যে কষ্ট হয়, সেটি কষ্টকর — এখানে সেই কথা বলা হচ্ছে না। যেমন, এটি ঘৃণা নয়। উদাহরণস্বরূপ, শীতের সকালে গরম কম্বল থেকে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে মসজিদে যাওয়া আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে কষ্টকর। কিন্তু আমরা এই কাজটিকে ঘৃণা করি না। আমরা এটি পছন্দ করি। কারণ এটি আল্লাহর ইবাদত এবং আল্লাহ আমাদের এটি আদেশ করেছেন। এতে আমাদের জন্য কল্যাণ আছে। কিন্তু আমি কষ্ট পাচ্ছি — এটি স্বাভাবিক কষ্ট। এই কষ্টের কারণে এই কাজে আমার অন্তরে উদ্দীপনার ঘাটতি হতে পারে। তাহলে সেটি কোনো সমস্যা নয়। সেটি কুফর নয়। আমি এর সঙ্গে সংগ্রাম করছি। সেই সংগ্রামে আমি সওয়াব পাচ্ছি। কিন্তু আমি যদি বিধানটিকেই ঘৃণা করতে শুরু করি — যদি আমি এই বিধানকে ঘৃণা করতে শুরু করি — তাহলে তা কুফর হয়ে যায়।